জান্নাতে আল্লাহ তাআলার দিদার: মুমিনের জীবনের পরম চাওয়া ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। At tarbiyah Online Madrasah
জান্নাতে আল্লাহ তাআলার দিদার:
মুমিনের জীবনের পরম চাওয়া ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত:
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করা প্রতিটি মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। জান্নাত এমন এক আনন্দের উদ্যান, যেখানে অফুরন্ত নেয়ামত, চিরশান্তি এবং মনোমুগ্ধকর চিরন্তন জীবনের আয়োজন রাখা হয়েছে। তবে জান্নাতের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সুন্দর হুর, সুস্বাদু পানীয় এবং স্বর্ণ-রূপার রাজত্বের চেয়েও হাজার গুণে বড় ও পরম আনন্দময় নেয়ামত হলো, স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের পবিত্র সান্নিধ্য ও দিদার (দর্শন) লাভ করা।
দিদারে ইলাহী: মুমিনের পরম আকাঙ্ক্ষা:
একজন প্রকৃত মুমিন দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ তাআলাকে না দেখেই তাঁর ওপর ঈমান আনে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর প্রেমে রাত জেগে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। তাই কিয়ামতের দিন এবং জান্নাতে পৌঁছে মহান রবের মোবারক দর্শন করাই হবে একজন ঈমানদারের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের এই মহা সৌভাগ্যের কথা ঘোষণা করে বলেন:
"সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও প্রফুল্ল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।" (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩)
অন্য এক আয়াতে জান্নাতবাসীদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
"যারা সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান (জান্নাত) এবং তার চেয়েও বেশি (আল্লাহর দর্শন)।" (সূরা ইউনুস: ২৬)
মুফাসসিরীনে কেরামের মতে, এই 'তার চেয়েও বেশি' বা অতিরিক্ত অংশটিই হলো মহান আল্লাহ তাআলার সুমহান দিদার।
হাদিসের আলোতে জান্নাতে আল্লাহর দর্শন:
হাদিস শরীফে জান্নাতে আল্লাহকে দেখার মুহূর্তটিকে অত্যন্ত রূপক ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন:
"তোমরা অবশ্যই তোমাদের প্রতিপালককে তেমনি স্পষ্ট দেখতে পাবে, যেমন এই পূর্ণিমার চাঁদকে দেখতে পাচ্ছ। তাঁকে দেখার ব্যাপারে তোমরা কোনো ভিড় বা বাধার সম্মুখীন হবে না।" (সহীহ বুখারী: ৭৪৩৬)।
জান্নাতে প্রবেশ করার পর যখন জান্নাতবাসীরা সব ধরনের সুখে নিমজ্জিত থাকবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ডেকে বলবেন, "তোমরা কি চাও আমি তোমাদের আরও কিছু বাড়িয়ে দিই?" তারা বলবে, "আপনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেননি? আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেননি?"
অর্থাৎ আমরা আর কিছু চাই না ইয়া রাব।
এরপর মহান আল্লাহ পর্দা উন্মোচন করে দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহ তাআলা যখন পর্দা তুলে নেবেন, তখন জান্নাতবাসীদের কাছে তাদের রবের দর্শনের চেয়ে অধিক প্রিয় ও সুস্বাদু আর কিছুই মনে হবে না।" (সহীহ মুসলিম: ১৮১)
জান্নাতের সব নেয়ামত কেন ম্লান হয়ে যাবে?
জান্নাতের অফুরন্ত সুখ-নেয়ামত, নেহালের স্রোত আর সুবর্ণ অলঙ্কারের সমস্ত জাঁকজমক থমকে দাঁড়াবে সেই মহিমান্বিত ক্ষণে যখন রাব্বুল আলামীন তাঁর কুদরতি সুষমার পর্দা উন্মোচন করবেন। অসীম সৌন্দর্য ও করুণার আধার সৃষ্টিকর্তাকে স্বচক্ষে দেখার সেই পরম অনুভূতির কাছে জান্নাতের সমস্ত আনন্দ ম্লান হয়ে যাবে; চোখের পলক ফেলা ভুলে অপলক দৃষ্টিতে মুমিন অন্তর ডুবে রবে এক অনন্ত আশেকানা প্রশান্তিতে।"
সমাপনী:
দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবন দুঃখ-কষ্ট, পরীক্ষা ও ত্যাগের জায়গা। কিন্তু জান্নাত হলো প্রতিদানের পরম আলয়। আর সেই প্রতিদানের চূড়ায় রয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলাকে সরাসরি দেখার অনুপম সৌভাগ্য। রব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে দুনিয়াতে ঈমান ও আমলের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দিন এবং আখেরাতে জান্নাতুল ফেরদাউসে তাঁর পবিত্র দিদার লাভের সুযোগ দান করুন। আমীন।
লেখক: মুফতী আব্দুল হামীদ সিলেটি
