নবজাতকের কানে আযান দেওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত | At Tarbiyah Online Madrasah
নবজাতকের কানে রাব্বুল আলামীনের মহিমা: জীবনের প্রথম পবিত্র ধ্বনি
একমুঠো শুভ্র আলো গায়ে মেখে নবজাতক শিশু যখন এই পৃথিবীর বুকে প্রথম চোখ মেলে, তখনো তার নিষ্পাপ আঁখিদুটি পুরোপুরি খোলেনি, যেন অনন্ত বিস্ময় আর অপার নিষ্পাপতায় ঘেরা এক অজানা জগতের গল্প লুকিয়ে আছে তার ওই নিমীলিত পলকে।
চরাচর কাঁপিয়ে ভেসে আসে তার জীবনের প্রথম কান্না, যা মূলত এই নশ্বর ধরণীতে তার পদার্পণের এক আগমনী বার্তা। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, পরম স্নেহে কোনো এক আপন কণ্ঠ তার কানের কাছে অবনত হয়ে ফিসফিস করে গেয়ে ওঠে এক চিরন্তন সত্য ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ মহান)।
কী অপরূপ সেই দৃশ্য! সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া একটি মানবসন্তানের কর্ণকুহরে প্রবেশ করা জীবনের প্রথম শব্দগুচ্ছ কোনো পার্থিব কোলাহল নয়, বরং স্বয়ং বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পরম বড়ত্বের ঘোষণা!
এই নবজাতক এখনো ভাষার বর্ণমালা শেখেনি, বোঝেনি কোনো জাগতিক ব্যাকরণ।
অথচ তাকে উদ্দেশ্য করে, তার অবোধ হৃদয়ের আঙিনায় প্রবেশ করা প্রথম পয়গামটি হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান। ইসলামে এটি কেবলই কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি এক চিরন্তন আত্মিক শিক্ষা, এক অবর্ণনীয় হৃদয়স্পর্শী সূচনা।
কিন্তু কেন এই আযান?
কারণ আমরা চাই, পৃথিবীর শত শোরগোল, যান্ত্রিক কোলাহল, মোহময় সুর কিংবা কোনো পঙ্কিল ডাক তার হৃদয়কে স্পর্শ করার আগেই সে যেন অবগাহন করে ঈমানের স্নিগ্ধ নূরে।
তার অবচেতন মন যেন প্রথম স্পন্দনেই চিনে নেয় এই সুবিশাল মহাবিশ্বে একমাত্র মহান সত্তা হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
এই ক্ষণস্থায়ী জীবন কেবলই আহার কিংবা খেল-তামাশার মঞ্চ নয়, বরং এটি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে অর্পিত এক পবিত্র আমানত এবং তাঁরই সান্নিধ্য পানে এগিয়ে যাওয়ার এক পবিত্র সফর।
ক্রন্দনরত সেই ছোট্ট শিশুটিকে যখন আমরা পরম মমতায় বাহুলগ্নে জড়িয়ে নিই, তার কপালে স্নেহের হাত রেখে আমাদের অন্তর তখন নীরবে আকুতি করে ওঠে,
‘হে নিষ্পাপ শিশু! এই পৃথিবী বড়ই ফিতনা আর গোলকধাঁধায় ঘেরা। তুমি এখানে এসে পথ হারিয়ে ফেলো না।
এই ব্যাকুল আশাটুকু বুকে নিয়েই তার কানের গভীরে গেঁথে দেওয়া হয় এক অমোঘ বাণী: ‘হে প্রিয় সন্তান! এই নশ্বর পৃথিবীতে তোমাকে প্রলুব্ধ করার মতো হাজারো ডাক থাকবে, কিন্তু তুমি কেবল তোমার রবের ডাকের প্রতিই সাড়া দেবে’।
আযানের প্রতিটি ধ্বনি যেন ফিসফিস করে তাকে বলে যায়, ধরণীর বুকে পা রাখার প্রথম মুহূর্তেই তুমি সমর্পিত হলে সেই পরম করুণাময়ের কাছে।
ভবিষ্যতের ঘূর্ণাবর্তে সে যেখানেই যাক, জীবনের তাগিদে যত বড়ই হোক কিংবা চেনা আঙিনা থেকে যত দূরেই হারিয়ে যাক না কেন, শৈশবের প্রথম প্রহরে শোনা এই পবিত্র সুর তার আত্মাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে তার আদি ও আসল পরিচয় ‘তুমি মুসলিম, তুমি কেবলই আল্লাহর বান্দা’।
নবজাতকের কানে এই আযান মূলত তার হৃদয়ের উর্বর জমিনে বিশ্বাসের এক পবিত্র বীজ বপন করা। আমাদের প্রত্যাশা সময়ের পরিক্রমায় সেই বীজ একদিন বিশ্বাসের এক সুউচ্চ মহীরুহে পরিণত হবে, ইংশাআল্লাহ।
🖆 লেখকঃ মুফতী আব্দুল হামীদ আল- আব্বাস সিলেটি
