মহাগ্রন্থ আল-কুরআন: হৃদয়ের আলো, জীবনের পাথেয় | কুরআনের গুরুত্ব। At Tarbiyah online Madrasah
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন:হৃদয়ের আলো, জীবনের পাথেয়
এক পরম সত্যের প্রতি আহ্বান
আজ আমরা এক মহা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। আজ আমি এমন এক বাণীর কথা বলব, যা মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায়, যা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থেকে টেনে এনে জীবনের সোনালী আলোয় দাঁড় করায়। এমন এক কিতাবের কথা, যা কেবল জড় শব্দের সমষ্টি নয়, বরং জীবন্ত এক হৃদয়ের ভাষা যা কেবল প্রথাগত পাঠের বিষয় নয়,এক শাশ্বত জীবনদর্শন।
সেই আলোকবর্তিকা, সেই পরশপাথর অন্যকিছু নয়,তা হলো হৃদয়ের স্পন্দন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন।
বাণীর অলৌকিকত্ব ও উম্মী নবী
এই কুরআন কোনো কবির কল্পনাপ্রসূত কাব্য নয়, কোনো প্রাজ্ঞ লেখকের বিনির্মাণ নয়। এটি মানুষের লেখা কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়, এটি আরশে আযীম ও সুদূর আসমানের সীমানা পেরিয়ে ধরণীর বুকে নেমে আসা মহান রাব্বুল আলামীনের এক অনুপম প্রেমের মহিমান্বিত ইশতেহার! আমাদের পরম দয়ালু প্রতিপালক কেবল আমাদের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা প্রকাশ করতে এবং এই অশান্ত পৃথিবীতে আমাদের শান্তিতে আগলে রাখার জন্যই এই ঐশী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগে, তপ্ত মক্কার এক মরুপ্রান্তরে, একজন উম্মী নবীর পবিত্র মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছিল এই অলৌকিক বাণী। একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে ভেবে দেখুন তো! যাঁর পবিত্র হাতে কোনো দিন কলম স্পর্শ করেনি, যাঁর পেছনে ছিল না কোনো জাগতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ছায়া, তিনি কীভাবে মহাবিশ্বের এমন অতলান্ত ও বিস্ময়কর জ্ঞানভাণ্ডার অবলীলায় উন্মোচন করলেন?
হৃদয়ের খোরাক ও মানবাত্মার আরোগ্য
কুরআন কেবল বিজ্ঞানের শুষ্ক সূত্রাবলি নয়, এটি ব্যথিত হৃদয়ের পরম আরাম, তৃষ্ণার্ত আত্মার সঞ্জীবনী খোরাক। কুরআনের প্রতিটি শব্দ যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, মুমিনের হৃদয় তখন প্রকম্পিত হয়। এর আয়াতগুলো যখন তিলাওয়াত করা হয়, অবাধ্য চোখ থেকেও অনুশোচনার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কারণ, এই বাণী শুধু কানের লতি ছুঁয়ে যায় না, তা সরাসরি মরণশীল মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।
এই ধরণীর বুকে এমন কি কোনো দ্বিতীয় কিতাবের অস্তিত্ব আছে, যা সাত বছরের কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে আশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত লাখো-কোটি মানুষ অবিকল নিজের হূদয়পটে ধারণ করে রেখেছে? এমন কোনো কিতাব কি আছে, যা একই সাথে মানুষকে অনুতপ্ত করে কাঁদায়, আবার পরম শান্তিতে বুকটা জুড়িয়ে দিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়?
আপনি হয়তো জাগতিক শিক্ষায় অশিক্ষিত, কিংবা হয়তো সমাজে আপনি চরম দরিদ্র, কিন্তু মনে রাখবেন! কুরআনের এই মহিমান্বিত আলো আপনাকেও সমানভাবে ডাকছে হেদায়াতের আলোকোজ্জ্বল রাজপথে।
ইতিহাসের সেই মহাজাগরণ ও আমাদের বর্তমান স্থবিরতা
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন, এই কুরআনই বদলে দিয়েছিল আরবের সেই চরম অন্ধকার ও বর্বর জাহেলি সমাজকে, যেখানে ফুটফুটে কন্যাসন্তানকে লোকলজ্জার ভয়ে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। সেই পাথুরে হৃদয়ের সমাজ এই কুরআনের পরশে এসে একেকজন দয়ার সাগর আর মানবতার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
কিন্তু হায় আফসোস! আজ আমাদের ঘরে ঘরে মখমলের কাপড়ে মোড়ানো কুরআন আছে, তবুও আমাদের যাপিত জীবনে এত অশান্তি কেন? কেন আমাদের চারপাশটা আজ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে? কারণ, আমরা কুরআনকে ওপরে ওপরে পড়ি ঠিকই, কিন্তু কুরআন আমাদের অবাধ্য হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। আমরা একে শুধু ঘরের উঁচু তাকের বরকতময় কিতাব বানিয়ে রেখেছি, আমাদের বাস্তব জীবনের কিতাব বানাতে পারিনি।
উপসংহার ও চূড়ান্ত আহ্বান
আসুন আমরা আবার ফিরে যাই আমাদের মূল ঠিকানায়, ফিরে আসি কুরআনের সুশীতল ছায়াতলে। চলুন, এই মহাগ্রন্থকে আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিই। হয়তো আজ আপনার পুরো জীবনটা কোনো এক গভীর পাপের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে, কিন্তু বিশ্বাসের সাথে হাত বাড়িয়ে দেখুন কুরআনের একটি মাত্র আয়াত আপনার সেই পুঞ্জীভূত অন্ধকারকে ভেঙেচুরে জীবনের নতুন এক আলো এনে দিতে পারে।
আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর পাঠানো সেই পরম প্রেমের চিঠি,পবিত্র কুরআনকে মন থেকে ভালোবাসি, তাকে বোঝার চেষ্টা করি এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকেই একমাত্র পাথেয় ও জীবনের দিশারী বানাই। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমিন।
লেখক: মুফিতী আব্দুল হামীদ আল- আব্বাস শ্রীমঙ্গলী
