জাওয়ালের সালাত কী? ফজিলত, সময় ও ৪ রাকাত নামাজের দলিল | সহিহ হাদিসের আলোকে।At Tarbiyah Online Madrasah
জাওয়ালের সালাত
একটি অবহেলিত সুন্নাহ ও আমাদের অনুচিন্তন।
![]() |
| সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আদায়কৃত চার রাকাত নফল নামাজের ফজিলত ও দলিল। |
আলহামদুলিল্লাহ, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর। অতঃপর:
সূর্য ঢলে যাওয়ার সময় (যাওয়াল) বলতে বোঝায়, যখন সূর্য আকাশের ঠিক মধ্যবিন্দু অতিক্রম করে পশ্চিম দিকে হেলে পড়তে শুরু করে। সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে ধীরে ধীরে আকাশের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে। এরপর যখন পশ্চিমমুখী হতে শুরু করে, তখনই যাওয়ালের সময় শুরু হয় এবং এ সময় থেকেই যোহরের নামাজের ওয়াক্ত প্রবেশ করে।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, হাদিসে বর্ণিত চার রাকাত নামাজটি সালাতুদ দুহা (চাশতের নামাজ) নয়। বরং তা হয় যোহরের পূর্বের সুন্নত, অথবা যোহরের সুন্নত থেকে পৃথক একটি বিশেষ নফল নামাজ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর যাদুল মা'আদ গ্রন্থে বলেন:
এ কথাও বলা হয়েছে যে, এই চার রাকাত যোহরের সুন্নত নয়; বরং এটি একটি স্বতন্ত্র নামাজ, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আদায় করতেন। ইমাম আহমদ (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনুস সায়িব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর চার রাকাত নামাজ পড়তেন এবং বলতেন, ‘এ সময় আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। তাই আমি চাই, এ সময় আমার কোনো নেক আমল আল্লাহর দরবারে উঠুক।
আল্লামা মুবারকপুরী (রহ.) শারহে মিশকাত-এ বলেন:
এই চার রাকাত হলো ‘সুন্নাতে যাওয়াল’। এটি যোহরের সুন্নত থেকে পৃথক একটি নামাজ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) আরও বলেন:
এটি একটি স্বতন্ত্র নামাজ, যার কারণ হলো দিনের মধ্যভাগ অতিক্রম করে সূর্য ঢলে যাওয়া। আল্লাহই ভালো জানেন, দিনের মধ্যভাগ যেমন রাতের মধ্যভাগের সমান্তরাল, তেমনি সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আসমানের দরজাগুলো খুলে যায়। আর রাতের মধ্যভাগের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। উভয় সময়ই আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য ও রহমতের সময়। এক সময় আসমানের দরজা খুলে যায়, আর অন্য সময় আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত অবতীর্ণ হয়।
তবে অপর একদল আলেমের মতে, এই চার রাকাতই যোহরের পূর্বের সুন্নত।
হাদিসের বর্ণনা:
ইমাম তিরমিযী (রহ.) আশ-শামায়িল-এ বর্ণনা করেছেন:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্য ঢলে যাওয়ার সময় নিয়মিত চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ সময় নিয়মিত চার রাকাত নামাজ পড়েন কেন?’ তিনি বললেন, ‘এ সময় আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং যোহরের নামাজ আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা বন্ধ করা হয় না। তাই আমি চাই, এ সময় আমার কোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছুক।
ইমাম তাবারানি তাঁর আল-মু'জামুল কাবির ও আল-মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে এই শব্দে (হাদিসটি) বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার এখানে অবস্থান করলেন বা মেহমান হলেন, তখন আমি তাঁকে জোহরের (ফরজ নামাজের) পূর্বে সর্বদা চার রাকাত (সুন্নত) সালাত আদায় করতে দেখেছি। এবং তিনি বলেছিলেন: যখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে, তখন আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
আর প্রশ্নকর্তা ভাই যে শব্দাবলি উল্লেখ করেছেন, তা ইমাম তাবারানি এবং ইমাম তিরমিযীর 'আশ-শামায়েল' গ্রন্থের বর্ণনারই শব্দাবলি।
আর আলবানী রহ: 'মুখতাসারুশ শামায়েল' গ্রন্থে একে সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
হৃদয়ের ক্যানভাসে কিছু অনুচিন্তন
উপরের নূরানি আলোচনা আর সহিহ হাদিসের অকাট্য প্রমাণ আমাদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি করে। আমরা জানতে পারলাম যে,সূর্য যখন মধ্যগগন থেকে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ে, তখন ওপরের আকাশটাতে এক নীরব মহোৎসব শুরু হয়। আসমানের সমস্ত বন্ধ দুয়ারগুলো একে একে খুলে দেওয়া হয় আল্লাহর বান্দাদের আমল আর দোয়াকে স্বাগত জানানোর জন্য। এটি এমন এক মায়াবী ও বরকতময় মুহূর্ত, যখন বান্দার চোখের পলক আর মনের আকুতি সরাসরি আল্লাহর আরশে গিয়ে কড়া নাড়ে।
অথচ কতটা আফসোসের বিষয়! অবহেলা, অসচেতনতা আর প্রচারের অভাবে আজ আমাদের সমাজ থেকে প্রিয় নবী (সা:) এর এই চমৎকার ও অতি প্রিয় সুন্নাহটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। আসমানের দরজাগুলো খোলা থাকে ঠিকই, কিন্তু আমাদের অলসতায় আল্লাহর দরবারে পাঠানোর মতো কোনো উপহার (নেক আমল) তখন তৈরি থাকে না।
আসুন না, এই অবহেলিত সুন্নাহটিকে আমরা আবার বাঁচিয়ে তুলি!
প্রতিদিন জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর পরই, দুনিয়ার সব ব্যস্ততাকে একপাশে সরিয়ে রেখে, এই চার রাকাত নামাজ আদায়ের এক দৃঢ় সংকল্প করি। আমাদের ভাঙা হৃদয়ের খাঁটি মোনাজাত আর এই ক্ষুদ্র সেজদাগুলো আসমানের খোলা দুয়ার গলে পরম করুণাময়ের আরশে পৌঁছে যাক,এটাই হোক আমাদের পরম আকুতি। সেই সাথে জোহরের ফরয সালাতটুকুও যেন প্রথম ওয়াক্তে, জামাতের সাথে মসজিদে গিয়ে আদায় করতে পারি, সেই চেষ্টাও করি।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার হাবিব (সা:)-এর এই হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহটিকে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেওয়ার তাওফিক দিন। আমাদের এই ছোট ছোট আমলগুলো কবুল করে আপনার রহমতের চাদরে আমাদের জড়িয়ে নিন। আমিন।
মূল আরবি প্রবন্ধ: Islamweb
বাংলা অনুবাদ ও সম্পাদনা: Mufti Abdul hamid Hathazari
